
মো: সোহেল মিয়া:
ভূমিকা: ‘মানুষের জন্মগত অধিকারই হলো মানবাধিকার’—এই ধ্রুব সত্যকে ধারণ করেই আধুনিক বিশ্বের পথচলা। ১৯৪৮ সালের ১০ ডিসেম্বর জাতিসংঘ ঘোষিত মানবাধিকারের সর্বজনীন ঘোষণাপত্র আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে, রাষ্ট্র, ধর্ম, বর্ণ বা লিঙ্গ নির্বিশেষে প্রতিটি মানুষ সমান মর্যাদা ও অধিকার নিয়ে বাঁচার দাবিদার। তবে বাস্তবে এই অধিকারগুলো অনেক সময়ই লুণ্ঠিত হয়। যখনই কোনো নাগরিক তার মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত হন, তখনই প্রয়োজন পড়ে আইনী সুরক্ষা ও শক্তিশালী সামাজিক নেতৃত্বের। বাংলাদেশে এই প্রেক্ষাপটে ‘আইনী সহায়তা কেন্দ্র (আসক) ফাউন্ডেশন’ একটি নির্ভরতার নাম হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছে।
মানবাধিকার কি ও কেন: মানবাধিকার কোনো দয়া বা দান নয়, বরং এটি প্রতিটি মানুষের বেঁচে থাকার অপরিহার্য উপাদান। খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা ও চিকিৎসার পাশাপাশি নিজের মত প্রকাশ, নিরাপত্তা এবং ন্যায়বিচার পাওয়ার অধিকারই হলো মানবাধিকার। এটি কেন গুরুত্বপূর্ণ? কারণ, মানবাধিকার লঙ্ঘিত হলে সমাজে অরাজকতা, বৈষম্য এবং অবিচার জেঁকে বসে। একটি উন্নত রাষ্ট্র ও মানবিক সমাজ গড়ে তুলতে হলে মানুষের মৌলিক অধিকার রক্ষা করা বাধ্যতামূলক। যখন একজন সাধারণ মানুষ ক্ষমতার দাপটে বা আইনী জটিলতায় দিশেহারা হয়ে পড়েন, তখনই মানবাধিকার সংস্থাগুলোর প্রয়োজনীয়তা অনস্বীকার্য হয়ে ওঠে।
আইনী সহায়তা কেন্দ্র (আসক) ফাউন্ডেশনের কাজ: আইনী সহায়তা কেন্দ্র (আসক) ফাউন্ডেশন বাংলাদেশে মানবাধিকার সুরক্ষা ও আইনী অধিকার প্রতিষ্ঠায় নিরলস কাজ করে যাচ্ছে। এই সংগঠনের মূল লক্ষ্য হলো সুবিধাবঞ্চিত, অসহায় এবং নির্যাতিত মানুষের দোরগোড়ায় ন্যায়বিচার পৌঁছে দেওয়া। আসক ফাউন্ডেশনের কার্যক্রমের প্রধান দিকগুলো হলো:
-
বিনা মূল্যে আইনী পরামর্শ: দরিদ্র ও প্রান্তিক মানুষেরা যারা অর্থাভাবে উকিল নিয়োগ করতে পারেন না, তাদের আইনী পরামর্শ প্রদান করা।
-
সালিশ ও মধ্যস্থতা: আদালতের বাইরে পারিবারিক বা সামাজিক বিরোধগুলো শান্তিপূর্ণভাবে মিমাংসা করার জন্য সালিশি ভূমিকা পালন করা।
-
নির্যাতন প্রতিরোধ: নারী ও শিশু নির্যাতন, যৌতুক প্রথা এবং সামাজিক সহিংসতার বিরুদ্ধে জনমত গঠন ও আইনী পদক্ষেপ নেওয়া।
-
কারাগার ও হাসপাতাল পরিদর্ষণ: কয়েদিদের অধিকার রক্ষা এবং সরকারি সেবা কেন্দ্রগুলোতে সাধারণ মানুষের প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করতে তদারকি করা।
মানুষের কল্যাণে আসক ফাউন্ডেশনের মাধ্যমে কি কি কাজ করা যায়: আসক ফাউন্ডেশন কেবল একটি আইনী প্রতিষ্ঠান নয়, বরং এটি একটি মানবিক প্ল্যাটফর্ম। এর মাধ্যমে বিভিন্ন উপায়ে জনকল্যাণমূলক কাজ করার সুযোগ রয়েছে: ১. আইনী সচেতনতা তৈরি: তৃণমূল পর্যায়ে সাধারণ মানুষকে তাদের আইনী অধিকার সম্পর্কে সচেতন করা। অনেক মানুষ জানেনই না যে তাদের অধিকার লঙ্ঘিত হচ্ছে। এই অজ্ঞতা দূর করা একটি বড় কাজ। ২. মানবাধিকার লঙ্ঘন প্রতিরোধ: কোথাও মানবাধিকার লঙ্ঘিত হতে দেখলে আসক ফাউন্ডেশনের মাধ্যমে প্রতিবাদ জানানো এবং যথাযথ আইনী ব্যবস্থা গ্রহণ করা। ৩. দুস্থদের পাশে দাঁড়ানো: প্রাকৃতিক দুর্যোগ বা সামাজিক বিপদে অসহায় মানুষের পাশে আর্থিক ও মানসিক সহায়তা নিয়ে দাঁড়ানো। ৪. শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবায় সহায়তা: অসচ্ছল শিক্ষার্থীদের শিক্ষা উপকরণ প্রদান এবং দরিদ্র রোগীদের চিকিৎসার জন্য যথাযথ কর্তৃপক্ষের সাথে সমন্বয় করা। ৫. দুর্নীতি ও শোষণের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানো: প্রশাসনের কোনো স্তরে অনিয়ম বা দুর্নীতি দেখলে যথাযথ প্রক্রিয়ায় সেগুলোর বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়া।
উপসংহার: মানবাধিকার রক্ষা করা কেবল সরকারের একার দায়িত্ব নয়, বরং এটি প্রতিটি সচেতন নাগরিকের নৈতিক কর্তব্য। আইনী সহায়তা কেন্দ্র (আসক) ফাউন্ডেশন সেই কর্তব্যের একটি প্রাতিষ্ঠানিক রূপ। সমাজে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা এবং বৈষম্যমুক্ত বাংলাদেশ গড়তে এই সংগঠনের ভূমিকা অপরিসীম। আসুন, আমরা ব্যক্তি হিসেবে সচেতন হই এবং আসক ফাউন্ডেশনের মতো প্রতিষ্ঠানের সাথে যুক্ত হয়ে আর্তমানবতার সেবায় নিজেদের নিয়োজিত করি। কারণ, মানুষের কল্যাণই হোক আমাদের জীবনের চূড়ান্ত লক্ষ্য।
